যাঁরা আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশ যেতে পারছেন না, তাঁদের জন্য ইসলামী ব্যাংক নিয়ে এসেছে এক বিশেষ প্রবাসী লোন সুবিধা। এই লোনের মাধ্যমে অভাবী ব্যক্তিরা খুব সহজেই আবেদন করে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
আজকের এই পোষ্টে আমরা জানবো আপনার ভিসা হয়ে যাওয়ার পরে কীভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রবাসী লোনের জন্য আবেদন করবেন, এই লোন পেতে হলে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন হবে।
তাছাড়াও ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি সর্বোচ্চ কত টাকা পর্যন্ত লোন নিতে পারবেন এবং এই লোনের সুদের হার কত হবে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন কি
ইসলামী ব্যাংকের এই প্রবাসী লোন সম্পূর্ণরূপে শরিয়াহ নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এটি সুদমুক্ত, বরং এটি মুরাবাহা হিসেবে পরিচালিত হয়, যা প্রবাসীদের বিদেশ যাত্রা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করে।
ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা এবং ডিজিটাল সার্ভিসের কারণে এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত ও সহজে সম্পন্ন করা যায়। সব মিলিয়ে, ইসলামী ব্যাংকের এই প্রবাসী লোন পদ্ধতি প্রবাসীদের আর্থিক স্বপ্ন পূরণে বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন পাওয়ার যোগ্যতা
ইসলামি ব্যাংকে প্রবাসী লোন নিতে গেলে মনে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন পাওয়ার যোগ্যতা কি? এই লোনের জন্যে বিবেচ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন-
- প্রথমত আপনাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বিদেশগামী ব্যক্তির বয়সসীমা অবশ্যই ১৮ থেকে ৪৫ এর মধ্যে হতে হবে।
- ইসলামী ব্যাংকের সাথে নিয়মিতভাবে লেনদেন থাকতে হবে।
- বিদেশগামী ব্যক্তির বয়স অবশ্যই ১৮ থেকে ৪৫ এর মধ্যে হতে হবে।
- তাছাড়াও লোন নেওয়ার জন্য আপনার প্রবাসী ভিসা সঠিক হয়েছে কিনা সেই তথ্যটি ইসলামী ব্যাংকে নিশ্চিত করতে হবে।
তবে হ্যাঁ, এই লোনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। যে সকল প্রবাসীরা নিয়মিতভাবে ইসলামী ব্যাংকের সাথে টাকার লেনদেন করেন, তাঁরা এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন।
এর পাশাপাশি, এই লোন নিতে হলে আবেদনকারীর আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এমন দু’জন গ্যারান্টার থাকা আবশ্যক। যদি এই গ্যারান্টার না থাকে, তবে তাঁদের লোনের জন্য বিবেচিত হবার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন নিতে কি কি লাগে?
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন নিতে যেসকল ডকুমেন্টস লাগবে তা নিচে উল্লেখ করা হল-
- ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন এর আবেদন ফরম;
- এনআইডি কার্ড এর কপি;
- বৈধ পাসপোর্ট + ভিসার কপি
- NID-এর ফটোকপি
- ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- আয়/কর্মসংস্থানের প্রমাণ
- ইউনিয়ন/পৌরসভার সনদ
- জামিনদারের NID + সম্পত্তি/FDR ডকুমেন্ট (৫ লাখ+)
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট (যদি থাকে)
এছাড়াও, এই লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী প্রার্থীকে তিনি যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের বৈধ ভিসা এবং পাসপোর্ট অবশ্যই নিজের সাথে রাখতে হবে, যাতে প্রয়োজনে যেকোনো সময় তা প্রদর্শন করা যায়।
একই সাথে, প্রার্থী প্রবাসে যে কোম্পানিতে কর্মরত আছেন, সেই কোম্পানির নিয়োগপত্র এবং বেতন রশিদ সহ প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। উপরে উল্লেখিত এই সমস্ত ডকুমেন্ট ব্যবহার করে আপনি খুব সহজেই ইসলামী ব্যাংকের প্রবাসী কল্যাণ লোন জন্য আবেদন করতে পারবেন।
দেখে নিন কিভাবে সহজ কিস্তিতে লোন পাওয়া যায় ।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন আবেদন পদ্ধতি
ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রবাসী লোন নেওয়া খুব একটা জটিল বিষয় নয়, তবে এই সুবিধা পেতে হলে অবশ্যই সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তবে সেই পদ্ধতি জানার আগে, আমাদের জেনে নেওয়া প্রয়োজন যে কারা এই লোনের জন্য আবেদন করতে পারবেন;
- বৈধ ভিসাধারী প্রবাসী বা বিদেশগামী
- ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টধারী (নিয়মিত লেনদেনকারী অগ্রাধিকার)
- বাংলাদেশী নাগরিক
- জামিনদারসহ (সম্পত্তি/FDR মূল্য কমপক্ষে ৫ লাখ)
- নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসী
এবার তাহলে চলুন, ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা ধাপে ধাপে জেনে নিই।
ধাপ ১ – ব্যাংকে যোগাযোগ করুন
ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রবাসী লোন পাওয়ার জন্য প্রথমেই আপনাকে ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে লোনের সকল শর্ত এবং আবেদনের নিয়ম কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।
আপনার যদি ইসলামী ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা না থাকে, তবে লোনের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অবশ্যই সেখানে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।
ধাপ ২ – লোন ফরম পূরণ করুন
লোনের জন্য ব্যাংকে যোগাযোগ করার পরবর্তী ধাপে আপনাকে ব্যাংক থেকে ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের ফরমটি সংগ্রহ করতে হবে এবং আপনার সকল প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সেই আবেদন ফরমটি পূরণ করতে হবে।
মনে রাখবেন, প্রবাসী লোনের আবেদন ফরম অবশ্যই সঠিক ও নির্ভুলভাবে পূরণ করা অত্যাবশ্যক, কারণ তথ্য সঠিক না হলে আপনার লোনের আবেদনটি বাতিলও হয়ে যেতে পারে।
ধাপ ৩ – প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস জমা দিন
লোনের আবেদন ফরমটি পূরণ করার পর আপনাকে তা ব্যাংকে জমা দিতে হবে, এবং একই সাথে লোনের আবেদনের জন্য ব্যাংক থেকে নির্ধারিত আপনার সকল প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসও জমা দিতে হবে। তবে আপনার সকল ডকুমেন্টস জমা দেওয়ার আগে অবশ্যই আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে সকল তথ্য সঠিক ও নির্ভুল রয়েছে।
ধাপ ৪ – অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করুন
প্রবাসী লোনের জন্য আপনার সকল কাগজপত্র এবং পূরণকৃত আবেদন ফরম ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়ে গেলে, এরপর আপনাকে ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের অনুমোদন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপনার সকল কাগজপত্র ও তথ্য যাচাই-বাছাই করবেন। এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষে, যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে সাধারণত তিন থেকে সাত কার্যদিবসের মধ্যেই আপনার লোনটি অনুমোদিত হয়ে যাবে।
ধাপ ৫ – লোন সংগ্রহ করুন
আপনার প্রবাসী লোনের আবেদন অনুমোদিত হলে, লোনের টাকা সংগ্রহের তারিখটি আপনাকে মোবাইলে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। সাধারণত, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর, নির্ধারিত দিনে আপনি ইসলামী ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দেখিয়ে নগদ লোনের টাকা সংগ্রহ করে নিতে পারবেন।
এভাবে, উপরে উল্লেখিত ধাপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করে আপনারা খুব সহজেই ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং এই সুবিধাটি পেতে পারবেন।
যোগাযোগ তথ্য
- হেল্পলাইন: ১৬২৫৯ / +৮৮০২৮৩৩১০৯০
- ইমেইল: info@islamibankbd.com
- ওয়েবসাইট: www.islamibankbd.com
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের পরিমাণ
ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রবাসী লোন হিসেবে সর্বোচ্চ কত টাকা এবং সর্বনিম্ন কত টাকা প্রদান করা হয়, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে করা হলো।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন প্রদান করে থাকে।
অর্থাৎ, আপনি এই স্কিমের অধীনে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত লোনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে, ইসলামী ব্যাংক তাদের কাস্টমারের প্রকারভেদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে যে তারা গ্রাহককে ঠিক কত টাকা লোন প্রদান করবে।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের সুদের হার
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন প্রদানের ক্ষেত্রে ৭.৫% মুনাফা গ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ, এই লোনের পরিবর্তে ব্যাংক ৭.৫% মুনাফা নিয়ে থাকে।
এখানে আপনি যে পরিমাণ টাকাই নিন না কেন, আপনার টাকার পরিমাণ অনুযায়ী আপনাকে ৭.৫% হারে (যা শরিয়াহ-সম্মত, সাধারণত ৭-১০% এবং পরিবর্তনশীল) ইন্টারেস্ট প্রদান করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোনের উদ্দেশ্য
প্রবাসী লোন প্রদানে ইসলামী ব্যাংকের বেশ মহৎ কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন—
- এই ঋণ প্রদান কর্মসূচির একটি লক্ষ্য হলো দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
- একই সাথে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
- এই স্কিমটি এদেশের দারিদ্র্যের হার কমিয়ে মানুষকে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে যেতে উৎসাহ ও সাহায্য প্রদান করে।
- ইসলামী ব্যাংক প্রবাসীদেরকে রেমিট্যান্স প্রদানে উৎসাহ যোগায় এবং দেশের অর্থ পাচার রোধ করাও এর একটি বিশেষ ব্যাপার।
- এছাড়া, বিদেশ ফেরত প্রবাসীদেরকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া এবং তার মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে মাথা পিছু আয় বৃদ্ধি করাও এর লক্ষ্য।
আর একটি প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের সমাজের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করার প্রয়াসে তাঁদের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতেও ইসলামী ব্যাংক লোন প্রদান করে। যারা প্রবাসে আছেন তাদের জন্য প্রবাসীদের ঈদে বাড়ি না যাওয়ার কষ্টের স্ট্যাটাস, মেসেজ ও কিছু কথা ।
FAQs
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন কারা পাবে?
দেশের সমস্ত খেটে খাওয়া কর্মজীবী প্রবাসীরাও লোন পেতে পারেন। কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তি ও তার অভিভাবক এই ঋন নিতে পারবেন। আবার যারা নিয়মিত লেনদেন করে থাকেন তারাও এই লোন পাবেন।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন পরিশোধের মেয়াদ কত বছর?
ঋণের পরিমাণ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে ২ বছর এবং, ২ লক্ষের অধিক হলে ৫ বছর।
ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন কত টাকা দেয়?
ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রবাসী লোন হিসেবে সর্বনিম্ন ২ লক্ষ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লোন দিয়ে থাকে।
ভিসা ছাড়া কি লোন পাওয়া যাবে?
না, বৈধ ভিসা বাধ্যতামূলক।
লোন নিতে জামানত লাগবে কি?
৫ লাখ+ সম্পত্তি/FDR + জামিনদার।
লেখকের শেষ মতামত
ইসলামী ব্যাংকের প্রবাসী লোন পদ্ধতি হলো আপনার বিদেশ যাত্রা ও স্বপ্ন পূরণের একটি শরিয়াহ-সম্মত পথ। সহজ আবেদন, সাশ্রয়ী কিস্তি এবং হালাল বিনিয়োগের কারণে এটি একটি অনন্য সুবিধা। আপনার ভিসা সম্পন্ন হয়ে গেলে আজই ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করুন। আপনার সাফল্যের যাত্রা শুরু হোক! ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী লোন পদ্ধতি সবসময় আপনার পাশে আছে।






